হরপ্পা সভ্যতাঃপ্রাচীনত্ব ও বিস্তার
হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীনত্ব ও বিস্তৃতি আলোচনা কর। অথবা, হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মত আলোচনা কর। 8
প্রাচীনত্ব : প্রাচীন বিশ্বের সভ্যতাগুলির মধ্যে হরপ্পা অনন্যতম। হরপ্পার সংস্কৃতির কাল নির্ণয় করা কঠিন। বিশেষত মহেঞ্জোদাড়োর ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় এবিষয়ে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কষ্টকর। বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছাড়াও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এবং মেসোপটেমিয়ার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে হরপ্পার কাল নির্ণয়ের একটি প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে।
জন মার্শাল প্রত্নতাত্ত্বিক খননের পর অনুমানের ভিত্তিতে মহেঞ্জোদাড়োর কাল নির্ণয় করেছেন। ৩২৫০-২৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ড. গাড উরে প্রাপ্ত হরঙ্গীয় সীলের ভিত্তিতে হরপ্পার কাল নির্ণয় করেছেন ২৩৫০-১৭৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। স্টুয়ার্ট পিগট ইরানীয় ও মেসোপটেমিয়ার স্বাক্ষ্যের ভিত্তিতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা ২৫০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলেছেন। মাটিমার হুইলার মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে হরক্ষীয় ধরণের সীলের ভিত্তিতে আবার হরপ্পার সাথে বর্হিদেশীয় যোগাযোগ স্থাপনের কালটি ২০০০-২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলেছেন। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, সিন্ধু সভ্যতা অন্ততঃ ৫০০ বছর ভ্রণ অবস্থায় ছিল তাহলে এই সভ্যতার জন্মলগ্ন দাঁড়ায় ২৩০০ =৫০০ = ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। মেসোপটেমিয়ার স্বাক্ষ্যের ভিত্তিতেই অলব্রাইট আবার সিদ্ধান্তে। এসেছেন ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটে।
সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা লোহার ব্যবহার জানত না। পণ্ডিতদের অনুমান খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ নাগাদ ভারতে লৌহযুগের সূচনা হয়। নিঃসন্দেহে হরপ্পা সভ্যতা এর পূর্ববর্তী।
আধুনিককালে রেডিওকার্বন পদ্ধতিতে হরপ্পার কাল নির্ণয়ের একটি প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে। কোয়েটা উপত্যকার নির্দশনের উপর ভিত্তি করে হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল ২০০০- ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কালিবঙ্গান ও কোটডিজিতে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুর উপর নির্ভর করে বলা হয় হরপ্পা সভ্যতা ২১৫০-২১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে পরিণত রূপ ধারণ করে। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে টাটা ইনস্টিটিউট অফ্ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের ড. ডি. পি. অগ্রবাল সিন্ধু সভ্যতার সমগ্র সময়কালকে ২৩০০-১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই সিদ্ধান্তকে স্বীকার করেছেন।
বিস্তৃতি : ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান পাকিস্তানের লারকানা জেলার সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরে মহেঞ্জোদাড়ো নগরীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। একই বছরে দয়ারাম সাহানী পাঞ্জাবের মন্টেগোমারি জেলার ইরাবতী নদীর পূর্ব উপকূলে হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিস্কার করেন। জন মার্শাল (১৯৩০), মাটিমার হুলার (১৯৪৭) এবং গর্ডন চাইল্ড (১৯৫৪) আরব সাগরের তীর থেকে হাজার মাইলের ব্যবধানের মধ্যে হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার করেন।
অবিভক্ত পাঞ্জাবের অধিকাংশ অঞ্চল, হরিয়ানা, উত্তর রাজস্থান, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিন বেলুচিস্তানে হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। মূলত এটি ছিল সমতলের সংস্কৃতি। তবে মান্ডা (জন্মু ও কাশ্মীর), রূপার ও চন্ডীগড় (পাঞ্জাব) প্রভৃতি নিম্ন হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল। ভারতে হরপ্পা সভ্যতার ২৬৯টি প্রত্নকেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলি হল পাঞ্জাব (৩৫) রাজস্থান (২৮), হরিয়ানা (৪৪), উত্তরপ্রদেশ (৩১) এবং গুজরাট (১৩১)।
মাটিমার হুইলার আরব সাগরের তীর থেকে হাজার মাইল ব্যবধানের মধ্যে অন্তত ৩৭০ টি জায়গায় হরপ্পার নিদর্শন প্রাপ্তির কথা বলেন। গর্ডন চাইল্ড এই সভ্যতার আরো বিস্তৃতির কথা বলেছেন। সম্প্রতি বেলুচিস্তানের মাকরাণ উপকূলে সুতকাগেনদার প্রত্নকেন্দ্রটি হরপ্পা সংস্কৃতির স্বাক্ষ্য দেয়। সিন্ধু ও পশ্চিম পাঞ্জাব ছাড়াও ভারতের যেসব এলাকায় হরপ্পা সভ্যতার স্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল রাজস্থানের কালিবঙ্গান, গুজরাটের লোথাল, ধোলাভিরা ও দেশলপার, শতদ্রুর তীরে রূপার, দিল্লীর কাছে মীরাট জেলার হিন নদীর তীরে অবস্থিত আলমগীরপুর (উত্তরপ্রদেশ), হরিয়ানার বানওয়ালি ও মিটাথল প্রভৃতি। উত্তর-পূর্ব আফগানিস্থানে অক্ষ নদীর তীরে অবস্থিত শোরটুগাই হরপ্পা সভ্যতার একটি বহিস্থ ঘাঁটি ছিল।
হরপ্পা সভ্যতার ভৌগলিক পরিধির যে পরিচয় পাওয়া যায় তা পূর্বে আলমগীরপুর থেকে। পশ্চিম সুতকাগেনদার এবং আফগানিস্থানের শোরটু গাই থেকে দক্ষিণে গোদাবরী উপত্যকার দহিমাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পূর্ব-পশ্চিমে এর বাপ্তি ছিল ১১০০ কি.মি. এবং উত্তর-দক্ষিণে ১৬০০ কি.মি.।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন