প্রশ্ন হরপ্পা সভ্যতার পতনে পরিবেশগত বিপর্যয় কতদূর দায়ী ছিল? [ উত্তর হরপ্পা সভ্যতার পতনের সম্ভাব্য কারণগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল। (ক) প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় (বন্যা, ভূমিকম্প, সিন্ধুনদের গতি পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের স্বল্পতা এবং মরুভূমির সম্প্রসারণ) (খ) বৈদেশিক আক্রমণ (অনেকের মতে আর্য জাতির আক্রমণ) ও গৃহযুদ্ধকে। তবে সাম্প্রতিকালে সিন্ধুবাসীদের রক্ষণশীল চরিত্র (উন্নত জলসেচের প্রতি অনাগ্রহ, নগর পরিকল্পনায় বৈচিত্র্যের অভাব, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি আগ্রহ হ্রাস) এবং কৃষি অর্থনীতির বিপর্যয়কে সিন্ধু সভ্যতার পতনের জন্য দায়ী বলে চিহ্নিত করা হয়।
পরিবেশগত বিপর্যয় : হরপ্পা সভ্যতার অবক্ষয়ের জন্য পরিবেশগত বিপর্যয়ের উপর প্রথম প্রণালীবদ্ধ যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন ওয়াল্টার ফেয়ারসার্ভিস। তার মতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরের আয়তন বৃদ্ধি এবং এর ফলে জমির পরিমাণ হ্রাস ও অরণ্য অঞ্চলের সংকোচন হরপ্পা অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট করে। জমির উর্ব্বরতা ক্রমশ হ্রাস পায়। অরণ্যের অবলুপ্তির ফলে বন্যা আর ক্ষরার ঘন ঘন আবির্ভাব ঘটতে থাকে। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো ইত্যাদি নগর ত্যাগ করে গুজরাট ও পূর্বভারতের দিকে নাগরিকদের অভিপ্রয়াণ শুরু হয়। নিকটবর্তী অধিবাসীদের হানাদারি ও লুঠতরাজের ফলে হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলি দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
ফেয়ারসার্ভিসের তত্ত্বের সঙ্গে সব বিশেষজ্ঞ একমত হতে না পারলেও তার গবেষণা একটি নমুনা গবেষণা হিসেবে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ফেয়ারসার্ভিস মহেঞ্জোদাড়োর চতুপার্শ্বস্থ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের একটা জরিপ করেছেন। এই সম্পদগুলির মধ্যে আছে মাটি, অরণ্য ও চারণভূমি। সেইসঙ্গে আছে নগরীর নিরূপিত জনসমষ্টির প্রয়োজনীয় খাদ্যের একটা হিসাব। নিরূপিত খাদ্য চাহিদার নিরিখে মহেঞ্জোদাড়োর চারপাশের এলাকার যেকোনো একটি বছরে কত হেক্টরে জমিতে শস্য কত উৎপাদিত হত তার হিসাব ফেয়ারসার্ভিস করেছেন। সেই একই সূত্র ধরে তিনি ভূকর্ষণের জন্য কতগুলি গবাদি পশু প্রয়োজন তার সংখ্যা এবং তার নিরিখেপুষ্ট হতে পারে না। এদের দরকার স্বাধীন বিচরণক্ষেত্র। তিনি সিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন, চারণভূমিতে
পশুদের স্বাধীন বিচরণ সর্বদাই একটি অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদের 'চরম হত্যালীলা'র কারণ। ওয়াল্টার ফেয়ারসার্ভিসের গবেষণা থেকে যে বিশ্লেষণ বেরিয়ে আসে তা হল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, মনুষ্যসৃষ্ট কোনো বিপর্যয়ের ফলেই হরলীয় নগরগুলি ধ্বংস হয়। সিন্ধুর অধিবাসীদের বেপরোয়া ভূমি কর্ষণ, ক্রমবর্ধিত চারণক্ষেত্রের ব্যবহার, অরণ্যাদি ধ্বংস করার ফলে জনগোষ্ঠীকে, বিশেষতঃ নগরের অধিবাসীদের জীবনযাপনের উপকরণ সরবরাহে উল্লিখিত অঞ্চলের মৃত্তিকার অক্ষমতা ইত্যাদি কারণে হরপ্পীয় নগরগুলি ধ্বংস হয়।
ফেয়ারসার্ভিসের গবেষণার মূল্যায়ন করতে গিয়ে শিরিণ রত্নাগর মন্তব্য করেছেন, জনসংখ্যা এবং গবাদি পশুর যে হিসাব ফেয়ারসার্ভিস দিয়েছেন তাতে যদি পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয় “তবু পরিবেশ নির্ভর ইতিহাসের এই যে মূল্যবান নীতিটি ফেয়ারসার্ভিস প্রতিষ্ঠিত করলেন, তাতে আমাদের অনুসন্ধান আকস্মিক এবং প্রাকৃতিক এই দুর্ঘটনার ধারণা থেকে অন্য কোনো অভিমুখে পরিচালিত হতে পারল।” সম্ভবত মহেঞ্জোদাড়োর কয়েকটি বিশেষ অংশ অতি জনবহুল ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের স্বাভাবিক উদ্ভিদ নিঃশেষিত হয়ে যায়।
ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব ফেয়ারসার্ভিসের গবেষণার সঙ্গে একমত নন। তিনি লিখেছেন, সিন্ধু লোকালয়ে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ছ'জনের বেশি ঘন ছিল না। এত স্বল্প ঘনত্বের কোনো লোকালয় তার অপর্যাপ্ত জমিকে এত শীঘ্র অনুর্বর করে তুলতে পারে না। তাছাড়া সেই কালের মানুষ ঝুম পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করত। সুতরাং একজায়গায় মাটি অনুর্বর হয়ে পড়লে অন্য জায়গায় তারা সরে যেতে পারতো।
(৫ নং দিলে উপরের উত্তর। ১০ নং দিলে নীচের প্রশ্নটির উত্তর লিখতে হবে। শুধু ‘পরিবেশজনিত কারণ’ এর পরিবর্তে ‘পরিবেশগত বিপর্যয় ঢোকাতে হবে। )
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন